১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন হলো ভারত। দিল্লির সংসদ ভবনে স্বাধীনতার উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিপর্যস্ত বাংলার নোয়াখালীতে মানুষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন মহাত্মা গান্ধী। পাকিস্তানে নতুন রাষ্ট্রের নেতৃত্বে ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। আর কাশ্মীরে বসে স্বাধীনতার আনন্দের পাশাপাশি তার অপূর্ণতার বেদনা নিয়ে কবিতা লিখছিলেন কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ।
ভারতের স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরও সেই দিনটির ঘটনাগুলো উপমহাদেশের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
স্বাধীনতার পথে শেষ ৭২ দিন
১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ঘোষণা করেন, ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে যাবে। এরপর ৩ জুন ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা প্রকাশ করেন।
পরবর্তী ৭২ দিনের মধ্যে শুধু ক্ষমতা হস্তান্তর নয়, ভারত বিভক্ত করে দুটি রাষ্ট্র গঠন, সেনাবাহিনী, প্রশাসন, রেলওয়ে, পুলিশ ও ডাকব্যবস্থা ভাগ করা থেকে শুরু করে সম্পদ ও অফিসের সরঞ্জাম পর্যন্ত ভাগ করার বিশাল কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছিল।
মাউন্টব্যাটেনের টেবিলে একটি ছেঁড়া ক্যালেন্ডার রাখা ছিল। সেখানে প্রতিদিন দেখানো হতো ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য আর কত দিন বাকি।
মধ্যরাতে নেহরুর ঐতিহাসিক ভাষণ
১৫ আগস্টের প্রথম প্রহরে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সংসদে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।
তিনি বলেন, বহুদিন আগে ভারত ভাগ্যের সঙ্গে একটি অঙ্গীকার করেছিল, আর সেই অঙ্গীকার পূরণের সময় এসে গেছে।
ঐতিহাসিক ভাষণের কয়েক মিনিট পর নেহরু ভাইসরয়ের প্রাসাদ (বর্তমান রাষ্ট্রপতি ভবনে) যান। স্বাধীন ভারতের গভর্নর জেনারেল হওয়ার জন্য তিনি মাউন্টব্যাটেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানান।
নেহরু মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম রয়েছে বলে একটি খামও মাউন্টব্যাটেনের হাতে তুলে দেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, সম্ভবত উত্তেজনার মধ্যে খামটি তালিকাবিহীন অবস্থাতেই সিল করে দেওয়া হয়েছিল।
মাউন্টব্যাটেনের জন্য ১৫ আগস্ট ছিল বিশেষ দিন
কিছু জ্যোতিষী ১৫ আগস্ট ১৯৪৭-কে অশুভ দিন হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তবে মাউন্টব্যাটেনের জন্য দিনটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যের।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জাপানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। তখন মাউন্টব্যাটেন মিত্রবাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। জাপানের বিরুদ্ধে বিজয়ের দিন হিসেবে ১৫ আগস্ট তার জীবনে বিশেষ স্মৃতি বহন করত।
কেন পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ১৪ আগস্ট?
ভারত স্বাধীন হওয়ার এক দিন আগে, ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সেদিন ছিল রমজান মাসের ২৬তম দিন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ করাচিতে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেছিলেন। অন্যদিকে নতুন রাষ্ট্রের বহু মানুষ তখন রোজা পালন করছিলেন।
তবে আইনগতভাবে পাকিস্তানেরও ১৫ আগস্ট স্বাধীন হওয়ার কথা ছিল। ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া ভারত স্বাধীনতা আইনে বলা হয়েছিল, ১৫ আগস্ট থেকে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন ডোমিনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হবে।
কিন্তু মাউন্টব্যাটেনকে করাচি থেকে দিল্লিতে যেতে হওয়ার কারণে পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা এক দিন এগিয়ে ১৪ আগস্ট করা হয়।
স্বাধীনতার দিনে নোয়াখালীতে গান্ধী
দিল্লিতে যখন স্বাধীনতার উৎসব, তখন মহাত্মা গান্ধী ছিলেন বাংলার নোয়াখালীতে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিপর্যস্ত এলাকায় তিনি খালি পায়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরছিলেন।
হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং একে অপরকে হত্যা না করার অঙ্গীকার করাতে তিনি কাজ করছিলেন। সঙ্গে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নিয়ে তিনি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে শান্তির আহ্বান জানাতেন।
এক গ্রামে গান্ধী স্থানীয় হিন্দু ও মুসলমানদের একসঙ্গে প্রার্থনা ও শান্তির অঙ্গীকারের জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আহ্বান জানান। কিন্তু কেউ আসেনি। প্রায় আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করেও যখন কাউকে পাওয়া গেল না, তখন গান্ধী শিশুদের নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করেন।
তিনি কয়েকজন শিশুকে বল নিয়ে খেলতে দেখেন এবং তাদের বলেন, তাদের বাবা-মায়েরা একে অপরকে ভয় পান, কিন্তু শিশুরা কেন ভয় পাবে? তিনি শিশুদের সঙ্গে খেলায় যোগ দেন।
প্রায় আধা ঘণ্টা শিশুদের সঙ্গে খেলার পর গান্ধী গ্রামবাসীদের উদ্দেশে বলেন, সাহসের অভাব তাদের মধ্যেই রয়েছে। সেই সাহস তারা চাইলে নিজেদের সন্তানদের কাছ থেকে নিতে পারে।
দিল্লিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গান্ধীর ক্ষোভ
দিল্লিতে ফিরে গান্ধী জানতে পারেন, তার অনুসারী সুভদ্রা যোশি কিংসওয়ে হাসপাতালে ভর্তি। তাকে দেখতে গিয়ে দিল্লির সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় কতজন নিরপরাধ মানুষ নিহত হয়েছেন, তা জানতে চান গান্ধী।
সুভদ্রা অনুমান করেন, নিহতের সংখ্যা এক হাজারের বেশি হতে পারে। গান্ধী জানতে চান, নিহতদের মধ্যে কংগ্রেসের শান্তিকর্মীরাও ছিলেন কিনা।
সুভদ্রা জানান, তাদের কেউ নিহত হননি। এতে গান্ধী বিস্মিত হন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি তারা নিরপরাধ মানুষকে রক্ষায় সত্যিই কাজ করে থাকেন, তাহলে তাদের মধ্যে কেউ প্রাণ হারালেন না কেন?
সুভদ্রা জানান, তারা সহিংসতা ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পুলিশ তাদের কথা শোনেনি। জবাবে গান্ধী বলেন, ব্রিটিশদের গুলির সামনে দাঁড়াতে পারলে নিজেদের পুলিশকে মোকাবিলা করতে না পারার কথা তিনি কীভাবে শুনছেন?
স্বাধীনতার ভোর নিয়েও ফয়েজের হতাশা
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট বিখ্যাত উর্দু কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ ছিলেন শ্রীনগরে। স্বাধীনতার দিনেও তিনি উপমহাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান অনুভব করেছিলেন।
সেই অনুভূতি থেকেই তিনি লেখেন বিখ্যাত কবিতা ‘সুবহ-এ আজাদি’ বা ‘স্বাধীনতার ভোর’।


